BFoundation | বঙ্গবন্ধু ও বাকশাল নিয়ে যুগ যুগ পরিকল্পিত মিথ্যাচার
949
page-template-default,page,page-id-949,qode-quick-links-1.0,ajax_fade,page_not_loaded,,qode_grid_1300,footer_responsive_adv,hide_top_bar_on_mobile_header,qode-theme-ver-11.0,qode-theme-bridge,wpb-js-composer js-comp-ver-5.1.1,vc_responsive
 

বঙ্গবন্ধু ও বাকশাল নিয়ে যুগ যুগ পরিকল্পিত মিথ্যাচার

বঙ্গবন্ধু ও বাকশাল নিয়ে যুগ যুগ পরিকল্পিত মিথ্যাচার

বঙ্গবন্ধু ও বাকশাল নিয়ে যুগ যুগ পরিকল্পিত মিথ্যাচার

 

বঙ্গবন্ধুর প্রায় সাড়ে তিন বছরের শাসনামলে(১৯৭২ থেকে ১৯৭৫)বেশ কিছু রাজাকার-আলবদর, কয়েকটি চরমপন্থী বাম দলের বেশ কয়েকজন নেতা-কর্মী আর জাসদ গণবাহিনীর বেশ ক’জন সদস্যের নিহত হওয়ার কথা আওয়ামী-বিরোধীদের মুখে অহরহই শোনা যায়। বঙ্গবন্ধু ও তাঁর দল আওয়ামী লীগ সেই সময়কালে রাষ্ট্রযন্ত্রসমূহ এবং দলীয় সন্ত্রাসীদেরকে ব্যবহার করে দেশজুড়ে ব্যপক হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিলো –এমন কথা সুযোগ পেলেই মুখস্থ বলে মুখে ফেনা তোলেন –এমন ‘বুদ্ধিজীবী’ এদেশে ভুরি-ভুরি রয়েছেন; তারা এসব কথা এখনও শুনিয়েই যাচ্ছেন। কিন্তু, ’৭২ থেকে ’৭৫ সাল পর্যন্ত সময়কালে আওয়ামী লীগের কত জন নেতাকর্মী খুন হয়েছিলেন, তার হিসেব কেন আওয়ামীপন্থীদের মুখে মাঝেমধ্যেও শুনি না? বিস্ময়কর হলেও সত্য, বঙ্গবন্ধুর ৩ বছর ৭ মাস ৩ দিনের শাসনামলে মোট আট জন সংসদ সদস্যই খুন হয়েছিলেন! বঙ্গবন্ধু তো ’৭২ সালে ক্ষমতায় বসেই বাকশাল নামের তথাকথিত একনায়কতন্ত্রটি কায়েম করেননি? তবে কেন ’৭২-এ বঙ্গবন্ধু শাসনভার কাঁধে নেয়া মাত্রই আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্যসহ নেতাকর্মীদের খুন করার হিড়িক পড়ে গিয়েছিল? আর, কারাই বা সেই হিড়িক ফেলেছিলো? প্রথমা প্রকাশন থেকে প্রকাশিত, আনোয়ার উল আলমের লেখা ‘রক্ষী বাহিনীর সত্য-মিথ্যা’ গ্রন্থ থেকে একটি অংশ উদ্ধৃত করছি— “চরম বামপন্থী, নকশাল বাহিনী, সর্বহারা ও জাসদের গণবাহিনীর হাতে আওয়ামী লীগের অনেক নেতা-কর্মী নিহত হন। নিহতরা হচ্ছেন:

 

· ১৯৭২ সালের ৬ জুন সংসদ সদস্য আবদুল গফুর নিহত হন। তাঁর সঙ্গে ছিল কামাল ও রিয়াজ নামের দুজন। তারাও নিহত হয়। আবদুল গফুর ১৯৭০ সালের নির্বাচনে খুলনা থেকে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।

 

· ১৯৭৩ সালের ৩ জানুয়ারি নিহত হন সংসদ সদস্য সওগাতুল আলম সগির। তিনি পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের নির্বাচনে মঠবাড়িয়া থেকে নির্বাচিত হয়েছিলেন।

 

· ১৯৭৩ সালের ৩ মে সংসদ সদস্য নুরুল হক নিহত হন। তিনি ১৯৭০ সালে পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য হিসেবে নড়িয়া থেকে নির্বাচিত হয়েছিলেন।

 

· ১৯৭৪ সালের ১০ জানুয়ারি নিহত হন সংসদ সদস্য মোতাহার উদ্দিন আহমদ। তিনি ১৯৭০ সালে ভোলা থেকে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।

 

· ১৯৭৪ সালের ১৬ মার্চ সংসদ সদস্য গাজী ফজলুর রহমান নিহত হন। তিনি ছিলেন নরসিংদীর মনোহরদী এলাকা থেকে নির্বাচিত প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য।

 

· ১৯৭৪ সালের ১ আগস্ট সংসদ সদস্য এডভোকেট ইমান আলী নিহত হন। তিনি জাতীয় পরিষদের সদস্য এবং ময়মনসিংহ আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ ছিলেন।

 

· ১৯৭৪ সালের ২৭ ডিসেম্বর কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে ঈদের নামায পড়ার সময় নিহত হন সংসদ সদস্য গোলাম কিবরিয়া। তিনি ১৯৭০ সালে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন।

 

· ১৯৭৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি সংসদ সদস্য আবুল খালেক নিহত হন। তিনি প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন নেত্রকোনা থেকে।

 

১৯৭২ সালে ২৯ জন, ১৯৭৩ সালে ৭৭ জন, ১৯৭৪ সালে ৫২ জন এবং ১৯৭৫ সালের জুলাই পর্যন্ত ৪৪ জন আওয়ামী দলীয় এমপি ও অন্যান্য জনপ্রতিনিধি, ছাত্রনেতা, শ্রমিকনেতা, মুক্তিযোদ্ধা, পুলিশ ও রক্ষীবাহিনীর সদস্যকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।” এই যদি হয় প্রকৃত সত্য, তাহলে ‘বাকশাল কায়েম’ করার দোষে বঙ্গবন্ধু খুন হয়েছিলেন –এটা আদৌ বলা যায় কি? নাকি, স্বাধীনতাবিরোধী পাকিস্তান-চীন-আমেরিকা চক্র এবং সেই চক্রের কুমন্ত্রে বিভ্রান্ত একদল মুক্তিযোদ্ধা হাতে-হাত মিলিয়ে বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করার যে কুৎসিত খেলা ’৭২ থেকেই শুরু করেছিলো, তারই ধারাবাহিকতার শেষ ধাপটি ছিলো বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা – এটা বলাই আরও অনেক বেশি যুক্তিযুক্ত হবে? বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরলেন ’৭২-এর ১০ জানুয়ারি, আর ৬ জুন খুন হলেন সংসদ সদস্য আবদুল গফুর! বঙ্গবন্ধু শাসনভার বুঝে নিতে না নিতেই এমপি খুন! ’৭২ থেকে ’৭৫ পর্যন্ত প্রতিটি বছরেই আওয়ামী লীগ দলীয় এমপিসহ অগণিত জনপ্রতিনিধি আর দলীয় নেতা-কর্মীদেরকে যে নৃসংসভাবে খুন করা হয়েছিলো, তা কি খুব স্বাভাবিক কিছু ছিলো? একটি রাজনৈতিক দল, যে দলটি কিনা নেতৃত্ব দিয়ে এই দেশ স্বাধীন করে দিলো, সেই দলটি রাষ্ট্রের শাসনভার নিতে না নিতেই ওই দলের নেতা-কর্মী-জনপ্রতিনিধিদের নির্মমভাবে খুন করার যে লীলা তখন শুরু হয়েছিল, তাতে করে আওয়ামী লীগ নামক দলটিকে, তথা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বকে রাষ্ট্রশাসনের কোনো সুযোগই দেয়া হয়নি, বরং নিজের অস্তিত্ব বাঁচানোর সংগ্রামেই দলটির প্রতিটি নেতা-কর্মীকে সর্বক্ষণ ব্যতিব্যস্ত থাকতে বাধ্য করা হয়েছে –এটা বললে কি একবিন্দুও ভুল বলা হবে? ওরিয়ানা ফালাচি’র সঙ্গে সাক্ষাৎকারে বঙ্গবন্ধুর সেই উদ্বেগ স্পষ্ট পরিলক্ষিত হয়; যারা পড়েছেন তারা নিশ্চই লক্ষ্য করেছেন। সুতরাং, এখনও যেসব জ্ঞানপাপী বঙ্গবন্ধু হত্যার পেছনে তাঁর ‘বাকশাল কায়েম’ করার সিদ্ধান্তটিকে দায়ী করেন, তারা আসলে জেনে-বুঝেই এই মিথ্যা কথাটি বারবার বলেন। এই মিথ্যাটি বলার একটি বিশেষ সুবিধা হলো, এতে করে সহজেই এক ঢিলে দুই পাখি মারা যায়; বঙ্গবন্ধুকে তাঁর ওই নির্মমভাবে মারা যাওয়ার পেছনে তাঁরই একটি সিদ্ধান্ত ‘বাকশাল কায়েম’ করাকে দায়ী করার পাশাপাশি, সেই ‘বাকশাল কায়েম’ করার সিদ্ধান্তটি যে বঙ্গবন্ধুর একটি ভুল সিদ্ধান্ত ছিলো এবং বাকশাল প্রকৃতপক্ষে কোনও ভালো কিছু না – সেটিও পরিষ্কারভাবে ইঙ্গিত করা হয়ে যায়! একেই বুঝি বলে ‘পারফেক্ট প্রোপাগান্ডা’!

 

বিস্ময়কর আর দুঃখজনক হলো এই যে, নব্য-হাইব্রিড কিছু মূর্খ্য আওয়ামী লীগারের কথাতেও ওই মিথ্যাটির রেশ পাওয়া যায়! ইউরোপের কোনও দেশের প্রথম সারির একটি রাজনৈতিক দল হলে এরকম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিভ্রান্তি এড়াতে নতুন নেতা-কর্মীদের জন্য নির্ঘাৎ নিয়মিত কর্মশালার আয়োজন করা হতো। আমাদের এই অভাগা দেশে সেরকমটা সম্ভব না হলেও, সিনিয়র নেতারা তো অন্ততঃ কর্মীদেরকে এসব ছবক দিতে পারেন? কিন্তু হায়, পুঁজিবাদের দাপটে ছবক-টবগ দেয়ার আর সময় কোথায়? জেনে অবাক লাগতে পারে – এসব নব্য-হাইব্রিড-মূর্খ্য আওয়ামী লীগারের দল ‘বাকশাল’ জিনিসটা আসলে কী – তার উত্তরই দিতে পারে না! ‘বাকশাল’ বিষয়ে এদের ধারণা রীতিমতো বিভ্রান্তিকর, গোলমেলে! নাম বলে খাটো করতে চাই না – মূল দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য জনৈক উপ-কমিটির সহ-সম্পাদককে ‘বাকশাল আসলে কী’ প্রশ্ন করার পর উত্তর পেয়েছি – “বাকশাল ছিলো বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের দল”! আরেক সদ্য-সাবেক ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির নেতাকে একই পশ্ন করার পর তিনি উত্তর দিয়েছেন– “বাকশাল হচ্ছে আওয়ামী লীগের এক্সটেনশন, বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ”! এসব শুনে আমি চরম শঙ্কিত! আমার প্রাণপ্রিয় নেত্রী শেখ হাসিনা কি দলের এই আদর্শিক দু্র্বলতার চিত্র কিছুটা আঁচ করতে পারেন? পারলে তিনিও নির্ঘাৎ আমার মতোই শঙ্কিত হয়ে উঠবেন। ভালো-মন্দ বিচার পরে– ‘বাকশাল’ কী, সেটা তো আগে জানা চাই? ‘বাকশাল’ একটি শাসনব্যবস্থার নাম। লক্ষ্য করলে দেখা যায়, বাকশালের পক্ষে থাকা লোকজন তো বটেই, এমনকি যারা বাকশালের বিরোধীতা করেন – তারাও মুখে বলার সময় বাকশালের সঙ্গে ‘কায়েম’ ক্রিয়াপদটি যোগ করেন। কাউকে কখনও শুনিনি ‘বাকশাল সৃষ্টি’ ‘বাকশাল তৈরি’ কিংবা ‘বাকশাল প্রয়োগ’ অথবা ‘বাকশাল’ শব্দের সঙ্গে ‘কায়েম’ ব্যতীত অন্য কোনও ক্রিয়াপদ যোগ করে এর নিন্দা জ্ঞাপন করতে! অর্থাৎ, ‘বাকশাল’ যে কোনও দল বা গোষ্ঠী বা সিদ্ধান্ত বা নিছক সংসদের কোনও বিশেষ বিল নয়, বরং এটি যে একটি পরিপূর্ণ শাসনতন্ত্রেরই নাম – তা নিজের অজান্তেই সবাই স্বীকার করে নেন, এমন কি এর বিরোধীতাকারীরাও। বিধানই একমাত্র কায়েম করা যায়, আর কিছুই কায়েম করা যায় না। ‘বাকশাল’ রাষ্ট্র পরিচালনার তেমনই এক পূর্ণাঙ্গ বিধান; একটি সমাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা; এবং নিঃসন্দেহে ‘অ্যামেরিকান ডেমোক্রেসি’ জাতীয় কোনও আধা-খ্যাঁচড়া শানসব্যবস্থা নয়। স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পরদিন ১১ জানুয়ারি ১৯৭২ তারিখে এই বঙ্গবন্ধুই তো ‘অস্থায়ী সংবিধান আদেশ’ জারির মাধ্যমে দেশে বহুদলীয় সংসদীয় পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছিলেন! সেই বঙ্গবন্ধুই যখন মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় একদলীয় ‘বাকশাল’ কায়েম করেন – তখন তার পেছনে অনেক কারণ অবশ্যই ছিলো; আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী-জনপ্রতিনিধিদের ওই লাগাতার খুন-গুম-নিখোঁজ হওয়াও নিঃসন্দেহে তার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ।

 

ইউপিএল থেকে প্রকাশিত মওদুদ আহমদ-এর Bangladesh : Era of Sheikh Mujibur Rahman গ্রন্থ থেকে জানা যায় – ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারী সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর (ধারা ১১৭/এ) মাধ্যমে বাকশাল গঠিত হয়। এটি ছিল এদেশে সমাজতান্ত্রিক কাঠামো রক্ষা করার জন্য বঙ্গবন্ধুর সর্বশেষ প্রচেষ্টা। পূর্বে গৃহীত বিভিন্ন সমাজতান্ত্রিক পরিকল্পনার ব্যর্থতা, বৈদেশিক বিভিন্ন রকম চাপ, দেশের ভেতর চীনপন্থী নকশাল ও জাসদসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দলের সরকার বিরোধিতা ও উগ্র কার্যকলাপ, আওয়ামী লীগের ভেতরে কিছু ষড়যন্ত্রকারীর অনুপ্রবেশ, সামরিক বাহিনীর একটি অংশের অসন্তোষ, ’৭৪-এর দুর্ভিক্ষ ইত্যাদি বিভিন্ন কারণে বঙ্গবন্ধু তাঁর শাসনব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার স্বার্থে দেশের এক জরুরী পরিস্থিতিতে একদলীয় ‘বাকশাল ব্যবস্থা কায়েম’ করেন। ১৯৭৫ সালের ৬ জুন বাংলাদেশের সকল রাজনৈতিক দল বিলুপ্ত করে একটি দল (বাংলাদেশ কৃষক-শ্রমিক আওয়ামী লীগ) বাকশাল গঠন হয়। দেশের সর্বস্তরের মানুষকে একিভূত করে ৭ স্তর বিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়। বাকশালের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু তৎকালীন দুর্ভিক্ষ পরবর্তী ভঙ্গুর অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার শেষ চেষ্টা চালান। মওদুদ আহমদের গ্রন্থে আরও উল্লেখ আছে, বঙ্গবন্ধু বাকশালে প্রাথমিক যে অর্থনৈতিক পরিবর্তন আনেন তা হলো Compulsory Co-operative Society, যাতে বলা হয়– প্রতিটি গ্রামের মানুষ এক হয়ে জমি চাষ করবে, চাষের উপকরণ দেবে সরকার, উৎপাদিত ফসল তিন ভাগ হবে, একভাগ পাবেন জমির মালিক, একভাগ চাষে নিয়োজিত শ্রমিকরা এবং আরেকভাগ সরকার। এই হলো ‘বাকশাল’। বঙ্গবন্ধু প্রণীত এই শাসনপদ্ধতিটির সুফল-কুফল কোনটাই বোঝার মতো নুন্যতম সময়টুকুও এদেশের জনগণকে দেয়া হয়নি! ফলাফল কি হতো তা বোঝার আগেই, বাকশাল কায়েমের মাত্র আড়াই মাসের মধ্যে, পঁচাত্তরের ১৫ আগষ্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হয়; আর এতে করে বাকশাল ব্যবস্থারও পতন ঘটে। হতে পারে এই শাসনব্যবস্থায় বেশ কিছু গলদ ছিলো; কিন্তু সেটা তো বঙ্গবন্ধু হত্যার মাত্র অল্প কয়েকদিন আগের ঘটনা! সময় পেলে আলোচনা-সমালোচনার মধ্য দিয়ে সেসব গলদ হয়তো সংশোধন হয়েও যেতে পারতো! আর, বাকশাল কায়েমপূর্ব পুরো সাড়ে তিন বছরের শাসনামলে বঙ্গবন্ধু যে শাসনব্যবস্থা চালিয়েছিলেন –সেখানে তো ‘বাকশাল’ জাতীয় কিছুর লেশমাত্র ছিলো না? সেটা তো ছিলো বহুদলীয় সংসদীয় গণতন্ত্র? তবে কেন ওই পুরো সাড়ে তিন বছর জুড়েই আওয়ামী লীগের অগণিত নেতা-কর্মী-জনপ্রতিনিধি নির্মমভাবে খুন হয়েছিলেন? একজন-দু’জন নয়, আট জন সংসদ সদস্য একে একে খুন হয়ে গেলেন, এমনকি ঈদের নামাজ পড়া অবস্থায়ও একজন নির্বাচিত এমপিকে খুন হয়ে যেতে হলো – এই যে অবস্থা বঙ্গবন্ধু শাসনভার নেয়া মাত্রই শুরু হয়ে গিয়েছিলো, তার পেছনে ষড়যন্ত্র ছাড়া আর অন্য কোনও কারণকে কোনভাবেই দায়ী করা যায় না। সংসদ সদস্য থাকা অবস্থায় এক আহসানউল্লাহ মাস্টার খুনের ঘটনায় গোটা দেশ কয়েকদিন অচল হয়ে গিয়েছিলো; সাবেক সংসদ সদস্য হওয়া সত্ত্বেও শাহ এএসএম কিবরিয়ার মৃত্যুতে বেশ কয়েকদিনের জন্য স্তম্ভিত হয়ে পড়েছিল গোটা জাতি; আর ওই সদ্য-স্বাধীন দেশে মাত্র সাড়ে তিন বছরে এক-এক করে আটজন ক্ষমতাসীন দলের এমপি খুন হয়ে গেলেন – এটা বঙ্গবন্ধুর কোন্ দোষে হয়েছিলো, তা কি দয়া করে কেউ বলতে পারেন?

 

অনেকের মুখেই শুনি, বঙ্গবন্ধুর গোটা শাসনকালই নাকি লুটপাট আর দুঃশাসনে পরিপূর্ণ ছিলো। আজব কথা! শাসক রাষ্ট্র কেমন শাসন করছেন, সেটা দেখে-শুনে-বুঝে তার মান বিচার করার জন্য যে নূন্যতম সময়টুকু প্রয়োজন, তা না দিয়েই বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বকে ‘খারাপ’ রায় দিয়ে তাঁর অনুসারীদেরকে হত্যা করা শুরু হয়ে গিয়েছিলো? এ কথাও মানতে হবে? ওয়ান-ইলাভেন পরবর্তী সেনা-সমর্থিত ফখরুদ্দিন তত্ত্বাবধায়ক-সরকারের কার্যকলাপ বিচার করতেও তো জনগণের এক বছরের বেশি সময় লেগে গিয়েছিল! দুই নেত্রী অন্তরীণ হওয়ারও বেশ কিছু সময় পর দেশের বোদ্ধা-সমাজ যেন একটু-একটু করে নড়ে-চড়ে বসা শুরু করেছিলেন মাত্র! আর ’৭২ সালে এই একই রাষ্ট্রের জনগণ মাত্র দু’-তিন মাসেই সরকারের কার্যকলাপ বিচার করে হিংস্র হয়ে উঠলো – এটা কিভাবে বিশ্বাস করা সম্ভব? আবার সেই জনগণই মাত্র আড়াই মাস না যেতেই ‘বাকশাল’ পদ্ধতির বিচার-বিশ্লেষণ সম্পন্ন করে বঙ্গবন্ধুকে পরিবারসুদ্ধ হত্যার রায় কার্যকর করে ফেললো? আহা আমার বিচক্ষণ জাতিকে – বঙ্গবন্ধুর মতো বিশাল নেতাকে বিচার করতে মাত্র দুই-তিন মাস সময় নেয়া হলো, আর ফখরুদ্দিনের মতো বিশ্বব্যাংকের দালালকে বিচার করতে বারো মাস পার! এসব মিথ্যাচার অনেক হয়েছে, এখনও হচ্ছে, এবার চিরতরে এসব বন্ধ করবার সময় এসেছে। বঙ্গবন্ধু আর বাকশালকে যারা ব্যর্থ বলে আখ্যা দিয়ে ’৭২ থেকে ’৭৫ সময়কালের প্রকৃত ইতিহাস এতদিন ধরে বিকৃত করে চলেছেন, তাদের আর একবিন্দু সুযোগ দেয়া মোটেও ঠিক হবে না। আমাদের বুঝতে হবে – একটি দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে সফল নেতৃত্ব দেয়া বঙ্গবন্ধুর মতো একজন কালজয়ী মহান নেতা ও তাঁর দল আওয়ামী লীগ এবং সেই নেতার মস্তিষ্কপ্রসূত একটি নতুন ও সময়োপযোগী শাসনব্যবস্থাকে বিচার-বিশ্লেষণ করার মতো নুন্যতম সময়টুকু না দিয়েই যারা তখন নৈরাজ্য আর হত্যাযজ্ঞে মেতে উঠেছিলো, সেই একই গোষ্ঠী ও তাদের সাঙ্গপাঙ্গরা বঙ্গবন্ধুর শাসনামল আর বাকশাল কায়েম নিয়ে আজও চরম মিথ্যাচার চালিয়ে যাচ্ছে। এসব নষ্ট-ভ্রষ্ট জ্ঞানপাপীদেরকে আর সাবধান কিংবা শায়েস্তা অথবা কোনঠাসা করার চেষ্টায় কেবল বৃথাই সময় নষ্ট করবেন না; বরং এদের সমূলে উৎপাটন করা প্রয়োজন। আর, তা করার এখনই যোগ্য সময়।

 

 

-ফেরদৌস আরেফীন

১০ ডিসেম্বর ২০১৪, বুধবার